দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কুষ্টিয়া নদীবেষ্টিত জেলা হলেও ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল নেই। ফলে নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধার অভিযানের জন্য প্রায় দেড় শ কিলোমিটার দূরের খুলনা থেকে ডুবুরি দলের আসার অপেক্ষায় থাকতে হয় স্বজনদের। এতে দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হচ্ছে। চলতি আগস্ট মাসেই জেলার বিভিন্ন নদীতে ডুবে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
ছোট-বড় অন্তত আটটি নদ-নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার জনপদ। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসনা, কালীগঙ্গা, কুমার ও সাগরখালীর মতো নদীর সঙ্গে জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা ও চলাচল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদীকেন্দ্রিক এই জেলায় প্রায়ই পানিতে ডুবে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটলেও উদ্ধারকাজে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত ডুবুরি দলের ব্যবস্থা নেই।
ফলে নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় কার্যকরভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করতে পারেন না। খুলনা থেকে ডুবুরি দল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। কোনো কোনো ঘটনায় এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
চলতি আগস্ট মাসেই কুষ্টিয়ার বিভিন্ন নদীতে ডুবে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড় ধসে নূরী খাতুন (৫) ও জামিলা খাতুন (৮) নদীতে পড়ে যায়। স্থানীয়রা জামিলাকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও নিখোঁজ নূরীর মরদেহ পরদিন মিরপুর উপজেলার পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।
১৪ আগস্ট সকালে কুমারখালীর শিলাইদহ পদ্মা ঘাটে নিখোঁজ হয় আট বছরের শিশু আলিফ হোসেন। পরে সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৪ আগস্ট কুমারখালী পৌরসভার এম এন বাঁধ এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে গড়াই নদীতে ডুবে মারা যান জেলে পরিমল মণ্ডল (৩৮)।
সর্বশেষ গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে দৌলতপুরের ভাগজোত ঘাটে পদ্মা নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় মাদ্রাসাছাত্র মোস্তাকিম হোসেন (১২)। স্থানীয়রা এ সময় আরেক শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও মোস্তাকিমকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়ায় নিজস্ব ডুবুরি দল না থাকায় সেদিন উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়।
মোস্তাকিমের মা শিউলি খাতুন আহাজারি করে বলেন, ‘আমার ছেলে ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে নদীর পাড়ে খেলতে গিয়ে ডুবে গেল। এখনো ছাওয়ালটার খোঁজ পেলাম না। খুলনা থেকে লোক আসবে, তারপর উদ্ধার হবে—এই অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।’
পরে খুলনা থেকে ডুবুরি দল পৌঁছালে শনিবার সকালে পদ্মা নদী থেকে মোস্তাকিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীতে কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাবে স্থানীয়ভাবে কার্যকর অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। স্থানীয়রা নৌকা, জাল কিংবা দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক ডাইভিং সরঞ্জামের বিকল্প হয়ে উঠতে পারছেন না।
সামাজিক সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাহাব উদ্দীন মিলন বলেন, ‘যে জেলায় পদ্মা ও গড়াইয়ের মতো প্রমত্ত নদী রয়েছে, সেখানে স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকা হতাশাজনক। অবিলম্বে কুষ্টিয়ায় স্থায়ী ডুবুরি দল মোতায়েন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ফায়ার স্টেশনে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা দরকার।’
পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনেরা একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শঙ্কায় থাকেন, অন্যদিকে কখন উদ্ধারকারী দল আসবে, সেই অপেক্ষাও করতে হয়। স্থানীয়রা নৌকা, জাল ও দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক সরঞ্জামের বিকল্প তাঁরা হতে পারেন না।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মোমিন ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সুযোগ থাকে। কিন্তু দূরের জেলা থেকে ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সেই সম্ভাবনা অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।’
কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেন বলেন, ‘কুষ্টিয়া একটি নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় এখানে নৌ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। জেলা পর্যায়ে আলাদা ডুবুরি দল না থাকায় বিভাগীয় শহর খুলনার ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রতিটি দুর্ঘটনায় খুলনার ডুবুরি দলের অপেক্ষা করতে গিয়ে আমরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি। জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ডুবুরি দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
নদীবেষ্টিত কুষ্টিয়ায় ডুবুরি দল না থাকায় প্রতিটি দুর্ঘটনায় খুলনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ নদীতে নিখোঁজের পর প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে যত দেরি হয়, জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও তত কমে। তাই দূরের জেলার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কুষ্টিয়ায় প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল গঠন এবং ঝুঁকিপূর্ণ নদীঘাটগুলোতে আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এমএস/